স্বপ্ন দেখো আকাশ ছোঁয়ার : বান কি মুন

প্রথমেই সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ। ধন্যবাদ আমাকে এখানে কথা বলার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য, আমার সামনে বসে থাকা ভবিষ্যতের তরুণ নেতৃত্বের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য।

আমার মনে হচ্ছে, আমি ঠিক জায়গায়ই এসেছি কথা বলার জন্য। এর কারণ কিন্তু এই নয় যে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ১৫০ বছরের প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়; এর কারণ হলো আজকের এই তরুণেরাই সামনের দিনগুলোতে আমাদের নেতৃত্ব দেবে।

কয়েক সপ্তাহ আগে আমি আমার নিজের দেশ কোরিয়ায় গিয়েছিলাম। ওখানে গিয়ে আমি আমার ছোটবেলার স্কুলে গিয়েছিলাম। স্কুলে গিয়ে আমার মনে পড়ে গেল আমার অতি প্রিয় এক শিক্ষকের কথা। সে সময় তিনি আমাদের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তিনি সব সময় একটা কথা বলতেন, ‘নিজের মাথা উঁচু করে ধরো মেঘের রাজ্য ছাড়িয়ে সুদূর আকাশে, কিন্তু নিজের পা যেন মাটিতেই থাকে।’ এ কথাটা আমিও বলতে চাই তোমাদের। তোমরা তরুণ প্রজন্ম অবশ্যই অনেক স্বপ্ন দেখবে, নতুন কিছু করার, বিশ্বকে নতুন কিছু দেওয়ার, কিন্তু যাই-ই চিন্তা করো না কেন, সেটা সফল করার পদ্ধতিটা যেন অবশ্যই বাস্তবসম্মত হয়। সব সময় বড় চিন্তা করো, প্রথাগত স্বপ্নের বাইরে সীমানা ছড়ানো স্বপ্ন দেখো। আমি তোমাদের বলব, বিশেষ করে তরুণ শিক্ষার্থীদের সব সময় স্পষ্টবাদী, সাহসী ও নির্ভীক হতে। বড় কিছু করার চিন্তা করো, তোমার ভবিষ্যৎ কিন্তু একেবারে শুধুই তোমার হাতে। নিজের স্বাধীন চিন্তা-চেতনাকে কাজে লাগাও নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য—নিজের চেয়ে বড় কিছু হওয়ার জন্য এবং এটা সম্ভব।

আজ আমি তোমাদের আমার নিজের জীবনের গল্প শোনাব। আমি তোমাদের জানাব আমি কোথা থেকে এসেছি আজকের এ পর্যায়ে। আমার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা কোরিয়ায়। দারিদ্র্য আর যুদ্ধ-ঝঞ্ঝার মধ্যেই বেড়ে উঠেছি আমি। জাতিসংঘ আমার যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ এবং আমার দেশের অসহায় মানুষকে বাঁচিয়ে ছিল। সে সময় জাতিসংঘের মাধ্যমে অনেক অস্ট্রেলিয়ানও আমার দেশকে সহযোগিতা করেছিল। তাদের জানাই কৃতজ্ঞতা। সেদিন যদি এমনটা না হতো, তাহলে আজ আমি হয়তো এখানে এভাবে আসতে পারতাম না।

আজ যে ‘প্রত্যাশার বিপ্লব’ শুরু হয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। বিশ্ববাসীকে এসব সাহসী জাতির সাহায্যে এগিয়ে আসতে হবে। এসব মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সবাইকে বিশ্বাস করতে হবে যে নিজের নেতাদের কাছ থেকে সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে সব মানুষের এবং এটাও জনগণের একটা মৌলিক অধিকার। কোরিয়ায় একটা প্রবাদ আছে, ‘তোমার হাতে যতগুলোই সুন্দর মুক্তা থাকুক না কেন, এগুলো যদি একসঙ্গে একই সুতোয় না গাঁথো, তাহলে কখনোই একটা সুন্দর গলার হার বানাতে পারবে না।’ এই একবিংশ শতাব্দীর কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা একাকী কোনো দেশের পক্ষে সম্ভব নয়। এ জন্য সব দেশকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। যারা একসঙ্গে কাজ করবে, সেসব জাতির সামনেই রয়েছে সুন্দর ভবিষ্যৎ। জলবায়ু পরিবর্তন, বিশুদ্ধ পানির অভাব, জ্বালানিস্বল্পতা, বিশ্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, খাবারের অভাব দূর করতে এবং নারীর ক্ষমতায়নে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। যেসব চ্যালেঞ্জের কথা বললাম, সেগুলোকে আপাতদৃষ্টিতে হয়তো আলাদা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এসব চ্যালেঞ্জ কিন্তু আসলে একে অপরের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। এগুলোর যেকোনো একটির সমাধান বের করতে গেলে একসঙ্গে অনেকগুলোর সমাধান করে ফেলা সম্ভব। এসব চ্যালেঞ্জকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে এবং সব জাতিকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

কখনোই স্বার্থপরদের সুযোগ দিয়ো না তোমাকে পেছনে ধরে রাখতে; পুরো দুনিয়ায় পরিবর্তন আনার ক্ষমতা এবং শক্তি তোমার নিজের মধ্যেই আছে। ভবিষ্যতের সুন্দর একটা বিশ্ব গড়তে পারো তুমিই। এ বিশ্বাসটা তোমার থাকতে হবে। নিজের ওপর আস্থা থাকতে হবে। সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলার দায়িত্ব তোমাদেরই নিতে হবে। তোমরাই গড়ে তুলবে সুন্দর এক পৃথিবী। অনেক শুভ কামনা রইল তোমাদের প্রতি। আশা করি, তোমরা সবাই সামনের দিনগুলোর জন্য নিজের একটা সুন্দর লক্ষ্য নির্ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *